
বিদ্যাকুটের সতীদাহ মন্দির: ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায়ের নীরব সাক্ষী
বিশেষ প্রতিনিধি :
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলা-এর বিদ্যাকুট গ্রামে অবস্থিত ঐতিহাসিক সতীদাহ মন্দির আজও উপমহাদেশের এক অন্ধকার সামাজিক প্রথার স্মৃতি বহন করে চলেছে। প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো এই স্থাপনাটি সতীদাহ প্রথার নির্মম ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হিসেবে পরিচিত।স্থানীয় জনশ্রুতি ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, বিদ্যাকুটের প্রভাবশালী জমিদার দেওয়ান রাম মানিক (রাম মানক) এই মন্দির নির্মাণ করেন। একসময় হিন্দু সমাজের কিছু অংশে প্রচলিত সতীদাহ প্রথার আওতায় স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীকে স্বামীর চিতায় আত্মাহুতি দিতে বাধ্য করা হতো। ইতিহাসবিদদের মতে, এ প্রথার ফলে অসংখ্য নারী অমানবিক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। সামাজিক সংস্কারক রাজা রামমোহন রায়-এর দীর্ঘ আন্দোলন এবং লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক-এর উদ্যোগে ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর ব্রিটিশ সরকার সতীদাহ প্রথাকে নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ ঘোষণা করে আইন প্রণয়ন করে। তবে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত তথ্যমতে, আইন প্রণয়নের কয়েক বছর পর ১৮৩৫ সালে দেওয়ান রাম মানিকের মাতাকে বিদ্যাকুটের এই সতীদাহ মন্দিরে সর্বশেষ সতীদাহ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সেখানে থাকা একটি নামফলক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এ ঘটনার অনেক তথ্য আজ আর সংরক্ষিত নেই। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মন্দিরটি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এখনো দাঁড়িয়ে রয়েছে। ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়ের স্মারক হিসেবে বিদ্যাকুটের এই সতীদাহ মন্দির গবেষক, ইতিহাসবিদ ও দর্শনার্থীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।স্থানীয়দের মতে, যথাযথ সংরক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ন-ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব। মন্দিরটি কেবল একটি স্থাপনা নয়, বরং নারী অধিকার, সামাজিক সংস্কার এবং মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের ইতিহাসও স্মরণ করিয়ে দেয়।
