দারিদ্র্য আর জীবিকার লড়াই: সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বিপাকে ১১ মৌয়াল

লেখক: ফয়েজ আহমেদ। সাতক্ষীরা,শ্যামনগর প্রতিনিধি।
প্রকাশ: ৫ মাস আগে

দারিদ্র্য আর জীবিকার লড়াই: সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বিপাকে ১১ মৌয়াল

ফয়েজ আহমেদ।সাতক্ষীরা,শ্যামনগর প্রতিনিধি।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার পশ্চিম সুন্দরবনে অবৈধভাবে মধু আহরণের অভিযোগে ১১ জন মৌয়ালকে আটক করেছে বন বিভাগ। এ সময় তাদের ব্যবহৃত দুটি নৌকা ও প্রায় এক হাজার কেজি মধু জব্দ করা হয়। পরে আইনগত প্রক্রিয়া শেষে তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, নিষেধাজ্ঞা চলাকালে অনুমতি ছাড়া সুন্দরবনে প্রবেশ করে মধু সংগ্রহ করেন ওই মৌয়ালরা। মধু সংগ্রহ শেষে ফেরার পথে পিনমারি খাল এলাকা থেকে টেংরাখালী বন টহল ফাঁড়ির সদস্যরা অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মশিউর রহমান।

তবে এ ঘটনার পেছনে শুধু আইনের বিষয় নয়, রয়েছে উপকূলীয় জনপদের মানুষের দীর্ঘদিনের জীবনসংগ্রামের বাস্তবতাও। সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার অসংখ্য পরিবার বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বনজ সম্পদ আহরণের ওপর নির্ভরশীল। দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের সংকট এবং পরিবারের ভরণপোষণের তাগিদে অনেক মৌয়াল ঝুঁকি ও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বনে প্রবেশ করেন। ফলে আইনের মুখোমুখি হওয়ার পাশাপাশি তাদের পরিবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, আটক মৌয়ালরা অপরাধী হিসেবে নয়, বরং জীবিকার সন্ধানে সংগ্রামরত বনজীবী হিসেবেও বিবেচনার দাবি রাখেন। তাদের অনেকেই পরিবার-পরিজনের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাই আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। বন রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং সরকারি বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে বন বিভাগের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত নিয়ম না মানলে বনজ সম্পদের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বন বিভাগের অভিযান ও আইন প্রয়োগকে বন সংরক্ষণের স্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বনজীবী মানুষের জীবন-জীবিকা এবং বন সংরক্ষণ—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই এখন সময়ের দাবি। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি আইনের যথাযথ প্রয়োগ অব্যাহত রেখে বননির্ভর জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা গেলে এমন ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে।

সুন্দরবনের মানুষ বনের সম্পদ রক্ষা করেই যুগ যুগ ধরে জীবন চালিয়ে আসছেন। তাই বনজীবীদের প্রতি সহমর্মিতা এবং বন রক্ষায় প্রশাসনের দায়িত্বশীলতা—উভয়ই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট সকলের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতির সমাধানে মানবিক ও টেকসই উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে, যাতে বনও বাঁচে, বননির্ভর মানুষের জীবনও নিরাপদ থাকে।